‘পেন্ডামিক’ সৈয়দ মুহাম্মদ জুবায়েরের গল্প

পেন্ডামিক
 সৈয়দ মুহাম্মদ জুবায়ের
    


‘আসসালামুওয়ালাইকুম স্যার। স্যার কি আমায় ডেকেছেন।’
‘হুমম। বসেন।’

বস কে খুব শান্ত মনে হচ্ছে। আজ বসকে আকাশি রংয়ের শার্টটা খুব মানিয়েছে। তাঁর চোখে মুখেও খিটমিটে ছাপটা চাপা পড়ে গেছে শার্টের রংটার জন্যে!

জাভেদ না বসে দাঁড়িয়েই আছে। একটু ভয়েই আছে। কারণ বসের ভয়েস খুব নরমাল। যে সব লোক সব সময় খেঁচমেঁচ করে তার নরমাল আচরণ ভয়ের কারণ হয়ে যায়। কঠিন কঠিন কথা স্বাভাবিক গলায় বলেন। 
‘কি হলো বসেন। চা খাবেন না কফি।’
বলেই একটা কলিং বাজালেন বস, আর সাথে সাথে পিয়ন এসে বলল, জি স্যার।

‘দু কাপ কফি দাও। জাভেদ সাহেব আপনি কি চিনি খান?’
‘জ্বি স্যার।’

পিওনের চোখে মুখে বিরক্তি ফুটে উঠল। পিওনরা অফিসের হাড়ির খবর সবার আগে টের পায়। পিয়ন জানে যে বস চিনি খায় না৷ তাই আমার চিনি খাওয়ার খবর পাওয়া মাত্রই পিয়ন চলে গেলো। বসের সাথে থাকায় তারও একটা পাওয়ার আছে। কারণ বস অফিসের ভিতরের খবর তার কাছে পায়।

‘জাভেদ সাহেব এই করোনার সময় দেশের কি পরিস্থিতি তা তো আর ব্যাখা করতে হবে না। আমাদের কোম্পানির অবস্থাও যে ভালো না সেটা তো নিজের চোখেই দেখছেন।’
‘জ্বি স্যার।’

প্রাইভেট কোম্পানিগুলো থেকে সবাই কম বেশি লোক ছাটাই করছে। আজ হল আমার পালা। এখন কি করবে বুঝছে না জাভেদ। জাভেদও খুব স্বাভাবিক থাকার চোষ্টা করছে।

কোন বিষয়ে আগে থেকে বুঝতে পারলে সেই বিষয়ে ধাক্কা কম লাগে। যেহেতু অফিসের অবস্থা ভালো না  তার মানে বুঝতে হবে। এই কফির কী অর্থ। এরই মধ্যে কফি চলে এলো। কফি চুমুক দিতেই মনে হলো পিয়ন ব্যাটা তার মগেও কোন চিনি দেয়নি, ভুলে গেছে।
বস কফিতে কোন চুমক দিল না৷ পাশে মগটা পড়ে রইলো। বস একটা কাগজ বের করে হাতের পাশেই রাখলো। বুঝতে বাকি রইলো না জাভেদের, আজ তার অফিসের শেষ দিন।

জাভেদ মনে করলো যে জব তো নেই। তাহলে কাগজে যাই লেখা থাকে থাকুক। আগে চিনি চাইতে হবে কফিটা মুখে দেয়া যাচ্ছে না।

‘স্যার কফিতে চিনি লাগতো। খুব তিতার কারনে মুখে দিতে পারছিনা।’

কলিংবেল চাপতেই পিয়ন এলো। বলল, কফিতে চিনি দাও। পিয়ন কফি নিয়ে গেলো, একটু পরে মগটা নিয়ে এলো। এবার কফিতে চিনি বেশি লাগছে৷ বেশির জন্য কফিটা খেতেই পারছি না।

‘জাভেদ সাহেব আপনেকে মুখে বলাটা আমার জন্য খুবই কষ্টকর তাই লিখিত আকারে দিতে হলো। আসলে আমি দুঃখিত। গত দুই মাসে কোন ব্যাবসা হয়নি৷ আপনাদেরও বেতন দেয়াও হয়েছে অর্ধেক। ঢাকা শহরে টাকা ছাড়া চলা যে কিরুপ তা আমি জানি।’

বলতে বলতে বসের গলার স্বর ভারী হয়ে আসলো। স্যারের নাকের ওপরের ভ্রুর অংশটুকু খানিকটা উপরে উঠে গেলো কপালেও কিছু বলিরেখা ফুটে উঠল। চোখের দুই কোনায় চামড়ায় কিছুটা ভাজ পড়ল। এই শ্যামলা চেহারার মানুষটার চোখে মুখে এক মায়ার অনুভূতি ফুটে উঠল। আর কিছু মুখে বললেন না। জাভেদ বসের চেহারা দিকে তাকিয়ে থাকলো। বসের এই রুপটা আগে কখনো দেখা হয়নি। সারাক্ষণ যে রাগী চেহারা নিয়ে বসে থাকে এবং একটুতেই চিৎকার চেঁচামিচি করে তাঁর চোখে পানি চলে এসেছে। 

চিঠিটা বুক পকেটে রেখে দিলো জাভেদ। কফিটাতে কয়েক চুমুক দিয়ে হাসি মুখে বলল,
‘স্যার আমি উঠি। আসসালামুওয়ালাইকুম।’

বস আর একটি বারও চোখের দিকে তাকালো না। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠতেই বসও চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। বসের উচ্চতা খানিকটা কম পাঁচ ফুট চার পাঁচ ইঞ্চি। ছোট খাটো রাগী মানুষটার বাধ্য হয়েই এই চাকরি থেকে আমাদের বিদায় দিচ্ছেন!

জাভেদ অফিস থেকে বের হল। মুখে মাস্ক পড়ে রাস্তায় হাঁটছে, তার চোখে চোখে চশমা। কেউ কিছু টের পাচ্ছে না। মাস্কের কারনে চেহারার কোন এক্সপ্রেশন দেখা যাচ্ছে না। রাস্তায় সকল মানুষের মুখে মাক্স পরা। তাই কারো এক্সপ্রেশন দেখা যাচ্ছে না। শুধু মানুষের চোখের কিছু এক্সপ্রেশন ধরা যাচ্ছে। যেমন ভ্রু কুঁচকে রেখেছেন এক কালো করে লোক। কোন কিছুর উপর বিরক্ত।

জাভেদ হাঁটছে আর ভাবছে মানুষের মুখমন্ডলে সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম বহু পেশী আছে৷ সারা দেহে যত পেশী তার থেকেও বেশি। আর এই পেশীগুলো দেহের অনান্য পেশীর মত নয়। এদের নিয়ন্ত্রণ করাটাও অনান্য পেশিদের মত না৷
কোন এক ডাক্তার বন্ধুর মুখে শুনেছিলাম যে আমাদের দেহে তিন ধরণের পেশী রয়েছে। এগুলি হল কঙ্কাল পেশী, মসৃণ পেশী এবং হৃদ্‌পেশী। এ তিন ধরেণের পেশীর তিন ধরণের কাজ। কঙ্কাল পেশী দ্রুত ক্লান্ত হয় এবং যা দেহশৈলীর সৌন্দর্যের কারণ। মসৃন পেশী ক্লান্ত হতে সময় লাগে আর হৃদপেশী ক্লান্ত হয় না সব সময় সচল।

দেহের কঙ্কাল পেশীগুলো বেশি ব্যাবহারের কারণে এর বৃদ্ধি ঘটে এবং তা প্রকাশও পায়। শ্রমজীবি মানুষদের দেখলে তা বুঝা যায়, কি পেটানো দেহশৈলী তাদের। দেহের সকল পেশীগুলো যেন দেহের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে দিয়েছে। তাদের দেহে চর্বির তুলনায় পেশীর সৌন্দর্য বেশি!

মুখমণ্ডলের পেশী নিয়ন্ত্রণ হয় আবেগ দ্বারা। যদিও বা দেহের পেশী চর্চার সাথে এর খানিকটা পরিবর্তন দেখা যায় তারপরও এর নিয়ন্ত্রণটা আসলে আবেককে কেন্দ্র করে। তাই মানুষের মুখমন্ডলে তার মনে ছাপ দেখতে পায়। উদাহরণ সবকিছুই খানিকটা পরিষ্কার করতে পারে। মানুষের কান্না পেলো তার সাথে সাথে তার কান্নার পেশী গুলো রিএক্ট করে ফেলল। আর মুখের একটা পরিবর্তন দেখা যায়। এটা সকল মানুষের প্রায় একই রকম।

তেমনি হাসলে, রাগ করলে, অভিমান করলে, অহংকার করলে, এমনকি অপমানিত হলেও। এইসব ইমোশনের সাথে মানুষের মুখের পেশীর পরিবর্তন ঘটে বলেই চেহারা বিভিন্ন রকম আকৃতি নেয়। চেহারায় একটা পরিবর্তন দেখা যায়। এই পেশী গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে মূলত ইমোশন অর্থাৎ মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখতে হয়। যা সচরাচর অভিনেতাদের করতে দেখা যায়।

বডি লেংগুয়েজ বলে যে বিষয়টা আছে তা দেখে একজন মানুষের মনের অবস্থা বলাটা হয়তো মনোবিজ্ঞানী ধরতে পারেন, তা সাধারন মানুষ পারার কথা নয়। তবে চেহারা দেখে বলা সহজ। কারণ চেহারায় ভ্রু ও চোখ তা সহজে বুঝিয়ে দেয়।

জাভেদ ভাবছে বস কি অভিনয় করলো না কি সত্যিই আমার জব চলে যাওয়ায় কষ্ট পেল। এখন বসের কারণে মন খারাপ লাগছে জবটা চলে যাওয়ার চাইতে। একটা পাথরের মত শক্ত লোক আমার কারণে চোখের পানি ফেলবে ভাবা যায় না। তিনি সবচেয়ে বেশি ঝাড়ি আমাকে দিয়েছে বলেই হয়তো আমার জব চলে যাওয়ায় মন খারাপ লেগেছে। আর অভিনয় করলে বুঝতে হবে লোকটির অভিনয় দক্ষতা ভালো।

শেক্সপিয়ারের খুব জনপ্রিয় উক্তি “পৃথিবী একটি রঙ্গমঞ্চ আর আমরা সবাই হচ্ছি পাত্র-পাত্রী (অভিনেতা অভিনেত্রী)।” তার কথাটা মেনে নিলে সবাই কম বেশি এই মুখমন্ডলের পেশীর চর্চা করে আসছি স্বজ্ঞানে অথবা মনের ভুলে।

আবার মানুষে চেহারা তার মনের আয়না৷ মানুষ তাই যখন যেরুপ বা পরিস্থিতিতে থাকে সেইরুপ ছাপ তার মনে পড়ে আর চেহারায়ও তা প্রকাশ পায়।

জাভেদ হাঁটতে থাকে ফুটপাথ দিয়ে ছায়াটা তার পায়ের কাছেই ঘুরছে। মানুষের গড় উচ্চতার থেকে খানিকটা বেশি উচ্চতা জাভেদের। গায়ের রং শ্যামলা, কোঁকড়া চুল দেখতে ছিমছাম। তার চেহারায় পরিশ্রম ও অভাবের একটা ছাপ লুকানো আছে৷

জাভেদ প্রতিদিন যে ব্যক্তির কাছ থেকে সিগারেট কিনে তাকে দেখা যাচ্ছে না বেশ কয়েক দিন হলো। একটা সিগারেটের বক্স নিয়ে ফুটপাতের পাশেই বসতো লোকটা। হয়তো পাশের বড় দোকান গুলো উঠিয়ে দিয়েছে। বড় দোকানে গিয়ে ৫টা বেনসন সিগারেট চাইলো জাভেদ।

দোকানদার বলল, খুচরা সিগারেট বেচিনা, কিনলে প্যাকেট কিনতে হবে। তাই জাভেদ বাধ্য হয়ে প্যাকেট নিল। পকেট থেকে সেনিটাইজার বের করে সিগারেটের প্যাকেটটি সেনিটাইজ করল। সিগারেট ওয়ালা মাস্ক পরা। তার চোখ ও ভ্রু দেখে কিছুই আচ করতে পারছে না তার মনের অবস্থা কি।

‘আচ্ছা ভাই সামনে যে একজন বৃদ্ধ সিগারেট বেচতো সে বসে না এখন।’

‘ও। উনি তো গ্রামে চলে গেছে। এখন আসলে কেউ তেমন খোলা সিগারেট কিনে না।’

জাভেদ বিশ্বাস করতে পারলো না কথাটা। সেই তো এখনো খোলা সিগারেট কিনে।

‘আপনেরা তাড়িয়ে দেননি তো?

‘ আরে না ভাই। সে তো আমার দোকান থেকে প্যাকেট কিনে ওখানে বেচতো। করোনায় ব্যবসা ভালো না তাই গ্রামে চলে গেছে।’

আবার হাটঁতে শুরু করলো। ভাবছে কান্নার চোখের পানি আর হাসার চোখের পানি কি এক! অবশ্যই না। কান্নায় পানি বেশি বের হয় হাসির পানি তেমন বের হয় না। মাস্ক পরা লোকের শুধু চোখ আর ভ্রু দেখে তার মনের পরিস্থিতি বলা যাচ্ছে না।

একটা বড় কৃষ্ণচুড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালো জাভেদ। সূর্যের প্রখরতা আজ বেশি, কাঠ ফাঁটা রোদ একেই বলে মনে হয়। কিন্তু বাতাস বইছে, এই বাতাসে কৃষ্ণচুড়া চিরল চিরল পাতাগুলো নড়ছে। তাই মাটির দিকে তাকালে মনে হয় রোদ আর ছায়ার এক অপূর্ব খেলা খেলছে। মনে হচ্ছে পানিতে ভাসছি ঝিলমিল ঝিলমিল করছে।

জাভেদ ওখানে বসে ভাবছে এখন কি হবে? জবটাও নেই। বাসায় বউ-বাচ্চা নিয়ে কি করবো। চোখে পানি চলে এসেছে। করোনায় চোখে হাত দিতে নেই। তাই হাত দিয়ে মুছলোনা জাভেদ, আরেকটি সিগারেট ধরালো।

জাভেদের ঢাকা শহরে তেমন ঘনিষ্ট আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কেউ নেই। গ্রাম থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করে ঢাকা এসেছিলো চাকরীর খোঁজে, ঢাকা শহরে এসেই ধোঁকা খেতে হয়েছিলো। প্রথমে একটা চাকরীর জন্য ভাইভা দিতে এক অফিসে গেল। সেখানে কিছু টাকার বিনিময়ে চাকরীটা পেল কিন্তু জয়েন করার দিন গিয়ে দেখে সেই অফিস নেই। এই হলো ঢাকা শহরের শুরু।

এক যুগ হয়ে গেলো ঢাকা শহরে আসায় কি হয়েছে। না হয়েছে কোন টাকা পয়সা, না হয়েছে কোন বন্ধু-বান্ধব। হয়েছে শুধুই কষ্ট। দ্বিতীয় স্বন্তানটা এই শহরে জন্ম নিয়েও দেখতে পারলো না দুনিয়াটা। জাভেদ বাসার উদ্দেশে রওনা হল।

জাভেদ দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করে একটা ঘুম দিল। এক ঘন্টার একটা গাঢ় ঘুম হল। ঘুমে সে দেখলো এক পরীর মত মেয়ে তার সাথে মেঘে মেঘে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এ মেঘ থেকে ও মেঘে, মেঘ গুলো আকাশটাকে সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। মেয়েটা জাভেদের হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে জানতে মনও চাচ্ছে না। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে তাদের দুজনের পড়নে কোন কাপড় নাই আবার কোনরুপ অশ্লীলও লাগছেনা। বরং সুন্দর অনুভুতি দিচ্ছে ভেসে ভেসে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ একটা কালো মেঘের কাছে চলে এলো। মেয়েটা সাদা থেকে কালো হয়ে গেলো। আগে সবসময় হাসছিলো এখন সে শুধুই কাঁদছে। জাভেদের হাত ছাড়তে চেষ্টা করছে কিন্তু হাত ছাড়াতে পারছে না। জাভেদের কান্না পেতে লাগলো। মেয়েটার চোখ দিয়ে অঝরে পানি পড়ছে, জাভেদের অস্থির লাগছে।

মেয়েটা হাত ছাড়ছে না। জাভেদ দেখছে মেয়েটা কদাকার হয়ে যাচ্ছে। জাভেদ সাদা মেঘ খুঁজছে কিন্তু পাচ্ছে না। এই কালো মেঘটা আরো বড় আকার ধারন করছে। মেয়েটা হঠাৎ করেই ওই কালো মেঘটাতে মিশে গেল। জাভদের হাত সে মোটেও ছাড়তে চাচ্ছিলোনা, মেয়েটা গলে গলে পড়ছে, কান্না করছে আর মিশে যাচ্ছে কালো মেঘটার সাথে। জাভেদের ঘুম ভাঙ্গে। ঠান্ডা ঠান্ডা লাগে।  বাহিরে দেখে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে।

বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতেই জাভেদের বউ বিথি চা নিয়ে হাজির৷ দু জন চা খাচ্ছে। জাভেদ একটা সিগারেট ধরায়ে বলল, আমার মেয়েটা কই। কি করে ও?
তোমার মেয়ে ঘুমায়, বিথি বললো।

বিথি এখনো জানেনা যে জাভেদের চাকরিটা চলে গেছে। জাভেদ কিভাবে বলবে বুঝছেও না, চাকরি ছাড়া সংসার চলবে কি করে, এ মাসটা তো চলে গেল প্রায়। আগামী মাস থেকে কি করবে, বাড়ি ওয়ালা, মুদি দোকানদার, কারেন্ট বিল, গ্যাস বিল আরও কত খরচ৷

দুজনই বারান্দায় গ্রিলের ধারে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। জাভেদ খুব সরল ভাবে বলল, শোনো…

বিথি তাঁকিয়ে বৃষ্টি দেখছে।
‘শুনছো?’

বিথি উদাস মনে বৃষ্টির দিকে তাকিয়েই আছে আর মৃদু স্বরে বলল, হু।

‘আমার চাকরিটা আর নেই।’
‘হুম।’

‘কি বললাম আর শুনলা কি? আমার চাকরীটা চলে গেছে।’
বিথি আবার নরম করেই বলল, গেছে ভালো হয়েছে। যা যাবার তা আগে চলে যাওয়াই ভালো।

জাভেদ-বিথির দ্বিতীয় সন্তানটা মারা যাবার পর থেকে বিথি একটু কেমন যেন হয়ে পরেছে। গত এক বছরে কোন কিছু নিয়ে টেনশন করতে দেখিনি। কোন কিছুতে তার অবাক লাগে না।

জাভেদ বলল, এখন কি হবে? কিভাবে চলবে সংসার?
‘না চললে নাই। সব চলতে হবে এমন তো নয়। আর যা চলবে তা আটকাবে কেমন করে।’
‘বুঝলাম না কিছু।’

বিথি বলল, শোনো টেনশন করো না। জব গেছে এটা এমন কিছু না। যে পরিস্থিতি চারপাশে করোনায়। আর গত দুই মাস ধরা তো তুমি অর্ধেক বেতন পেতে। চলছে না তারপরও, কোন কিছুই আটকে থাকে না!

জাভেদ চায়ের খালি কাপটা বিথিকে দিল আরও একটা সিগারেট ধরালো। বিথি কাপ দুটো পাশেই রেখে দিতে দিতে বলল, একটা নিউজ শুমলাম ঢাকা শহরের ৫০/৬০ হাজার নিম্ন মধ্যবিত্তদের ঢাকা ছেড়ে দিতে হবে। আমার তাদের দলের একজন হবো। এইতো…

জাভেদ মেয়ের কাছে গিয়ে শুয়ে থাকলো। বেশ কিছুক্ষণ ভাবলো কি করা যায়। মানুষের মধ্যে করোনার কোন ভয় দেখা যায় না। মানুষ জন টিকে থাকার কারণে এখন কাজ খুঁজছে। কোন রকম চাপ নিতে পারছে না।  আবার চাপ লাগছেও না।  চাপ নিয়ে কি করবে৷ জব তো আর পাওয়াও যাবে না। মেয়েটার মুখের দিকে তাকালো, কি নিস্পাপ চেহারা। মেয়ের চেহারা দেখে মনটা ভরে গেলো।

নিঝুম ঘুম থেকে উঠে মুখ ফুলে বসলো। কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। নিঝুম ফোর্থ গ্রেডে পড়ে। পড়াশুনায় মনোযোগী না, তার পুতুল নিয়ে খেলতে ভালো লাগে। সে পুতুল নিয়েই ঘুমায়, তার পুতুলের নাম টয়া। সে টয়াকে নিয়ে এক জগৎ বানিয়েছে। তার দুইটা জগৎ। একটা খুব কষ্টের সেখানে পড়াশুনা করতে হয়, দুধ খেতে হয়। যত অপছন্দের কাজ গুলো করতে হয়।

আরকটা জগৎ খুব আনন্দের সেখানে সে যা বলে সেটাই হয়। সেই রাজ্যে টয়া তার ঘনিষ্ট বন্ধু। তার সাথে করে সে চিড়িয়াখানা ঘুড়তে যায়, পাহাড়ে যায়। যা মন চায় রান্না করে খায়। এই জগতের সব কিছু ভালো কিন্তু এই জগতে বেশিক্ষণ থাকতে দেয় না। 

নিঝুমের তিন মাস হলো স্কুল যেতে হয় না। পড়া দিতে হয় না ম্যাডামকে, খুব আনন্দে আছে সে। বাসায় একজন ম্যাম পড়াতে আসতো উনিও আসে না। তাই সে তার আনন্দের জগতে বেশি সময় দিতে পারে।

জাভেদ হাত বাড়িয়ে বলল, মা চল বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে দেখি। নিঝুম জাভেদের কোলে করে বারান্দায় গিয়ে বৃষ্টি দেখছে। বিকেল হলেও মেঘ কালো করে আসাতে সন্ধ্যে মনে হচ্ছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ ঝিলিক দিচ্ছে তখন নিঝুম বাবার বুকে মাথা লুকাচ্ছে।

বিথি এক মগ দুধ নিয়ে এসে হাজির হলো। নিঝুম মগ দেখেই, না না আমি দুধ খাবো না। আমার ভালো লাগে না বলল।

জাভেদ বলল, মা দুধ না খেলে তোমার বুদ্ধি হবে না তুমি ভালো রেজাল্ট করতে পারবে না। তোমার শক্তি হবে না। নানার রোগ হবে। এক চুমুকে খেয়ে ফেলো মা।
নিঝুম জানে যে এটা খেতেই হবে। যতই না না করি না কেন আমাকে খেতেই হবে। তাই চুপ করে মন ভার করে থাকে। জাভেদ মগটা হাতে নিয়ে দুধ খাওয়ায়।
নিঝুম বলল, বাবা আমরা ঈদে দাদু বাড়ি যাবো না। গত ঈদে তো যাইলাম না। 

‘এই ঈদে যাবো। গত ঈদে তো করোনার কারনে যেতে পারলাম না মা।’

দাদু বাড়ি গেলে নিঝুমের আনন্দের আর শেষ থাকে না। ওখানে কেউ তাকে জোর করে না। ওখানে পড়তে বসতে বলে না কেউ। কিন্তু ওখানে বেশিদিন থাকা হয় না।
নিঝুম বলল, বাবা এবার কিন্তু ওখানে অনেক দিন থাকবো। ওখানে গেলে অনেক মজা হয়।

নিঝুমের দুধ খাওয়া শেষ হয়ে যায়। মাগরিবের আযান ভেসে আসে। নিঝুমকে এখন এক ঘন্টা পড়তে হবে, আবার সেই পঁচা কাজ৷ নিঝুমকে মা পড়তে বসায়।

জাভেদ টিভিতে সংবাদ শুনতে থাকে। করোনার পরিস্থিতি নিয়ে টিভি চ্যানেলগুলো একের পর এক সংবাদ চলতে থাকে এসব দেখে মনের মধ্যে ভয় কাজ করে। সিগারেট ধরায় জাভেদ আর ভাবতে থাকে কি করবে। জমানো টাকা দিয়ে চলবে কি না। কিছু টাকা সঞ্চয় আছে তা বসে বসে খেতে সময় লাগবে না। এই পরিস্থিতিতে কোন জব পাওয়া যাবে কি না। মাথায় কোন বুদ্ধিও আসছে না। নিম্নবিত্তরা সহজে সব পরিস্থিতিকে সামাল দিতে পারে। উচ্চবিত্তরাও দুম করে একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারে। মধ্যবিত্তদের হলো ঝামেলার। এদের না আছে সাহস না আছে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার ক্ষমতা। এদের আছে আত্মসম্মান বোধ, আর কে কি ভাববে তা চিন্তার করার এক প্রগাড় ক্ষমতা এবং সে চিন্তা করে নিজেকে টিকিয়ে রাখার ইচ্ছা।

রাতে খেয়ে দেয়ে শুতে গিয়ে বিথির সাথে আলোচনায় বসলো জাভেদ। জাভেদ কোন ডিসিশন বিথিকে ছাড়া সে নেয় না৷ বিথি খুব মেধাবী ছাত্রী ছিল, তার সংসার নিয়ে ভাবনাটা কমে যাওয়ায় আরেক সমস্যা। সে আগের মত সংসার নিয়ে ভাবে না। সে মনে করে যে তার সন্তানটা মারা যাওয়ায় তার নিজের গাফলতি আছে।

কারণ নিঝুমের জন্ম হয়েছে গ্রামে তাই তার এই সন্তানটাকে সে ঢাকায় জন্ম দিতে চেয়েছিলো। এতে করে সে নিজের যথেষ্ট যত্ন নিতে পারেনি। দোষ যে জাভেদকে দেয়নি তাও না। সে কোন বড় হসপিটালেও নিতে পারেনি৷ এই টানাটানির সংসারে কি দোষ দিবে। সন্তান মারা যাওয়ার পরে ঠিক মত কথা বলেনি তিন মাস। এক একাই সময় পার করতো। জাভেদও তাকে কোন কিছু বলত না। কি বা বলার আছে। এই রকম একটা ফুটফুটে বাচ্চাকে কবর দেয়া। এমনও না যে কোন বড় ধরনের সমস্যা।

বিথি ঘরে ঢুকলে জাভেদ বলে, এই শুনো আমার খুব টেনশন লাগছে। কি করবো কিছুই তো বুঝছি না। আমার মাথায় কোন বুদ্ধি আসছে না। কিছু টাকা ব্যাংকে আছে। এই টাকা তো দেখতে দেখতে শেষ হয়ে যাবে। কি করবো বলতো।

বিথি বলল, শোনো এখন কিছু ভাবতে যেয়ো না। আজ সকালে তোমার চাকরিটা গেছে, তুমি এটা নিয়ে ভেবো না। মনে করো যে চাকরি আছে সাত দিনের ছুটি নিয়েছ। এখন ভাবলে সব নেগেটিভ চিন্তাই আসবে। সাতটা দিন যাক আমরা দেখি কি হয়। এত অস্থির হলে তো হবে না, এসো ঘুমাই আজকে।

মশারী টানিয়ে লাইট নিভিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়লো বিথি৷ জাভেদও শুয়ে পড়লো কিন্তু কোন ভাবেই চোখের পাতা এক করা যাচ্ছে না। বেশ কিছুক্ষন বিছনায় এপাশ ওপাশ করলো। উঠে বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানি দিয়ে আসলো। পানি খেলো। বারান্দায় গিয়ে সিগারেট জ্বালিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। ভাঙ্গা চাঁদটা একাই জেগে আছে। সিগারেটের ধোঁয়া গুলো ভেসে ভেসে যাচ্ছে। সিগারেটটা শেষ করেও চুপ করে তাঁকিয়ে আছে। বিথি নিশ্চুপে পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে হাতটা ধরলো।

জাভেদ আরো শক্ত করে ধরলো। বিথি জাভেদকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। বেশ শক্ত করেই ধরে কানে কাছে বলল, কিছু ভেবো না। জাভেদের মনের চাপটা কেমন যেন উধাও হয়ে গেলো। বিথি জাভেদ ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল।


এই বাসাটায় গত পাঁচ বছর হলো জাভেদ আছে। এত দীর্ঘ সময় কোন বাসায় থাকা হয়নি। এই বাসায় থাকার কারণ দুইটা ছিলো প্রথম কারণ বাড়িওয়ালা কখন কোন রকম খারাপ আচরণ করেনি বরং উনার সাথে সম্পর্কটা খুবই মধুর, বাসাভাড়াটাও সহণীয় আর দ্বিতীয় হচ্ছে এখন থাকে নিঝুমের স্কুল কাছে।

নিঝুমকে খুব আদর করে এই বাড়ির মালিক। বাড়ির মালিকের নাম জাকের আলি। বয়স ৬৫ উর্দ্ধ, হালকা গড়নের বেশ লম্বা ছয় ফুট উচ্চতা, সাদা চুল ও দাড়ি।  মাথায় একটা নেহেরু টাইপ সাদা টুপি, সাদা পাঞ্জাবি ও লুঙ্গিতেই তাকে সব সময় দেখা যায়। দেখতে অত্যন্ত আন্তরিক হলে মেজাজ খুব খিটখিটে। এই ভদ্রলোকের আসে পাশে তেমন কেউ ঘেষে না। জাকের সাহেব নিঝুমকে পছন্দ করেন কেন জানিনা। তবে নিঝুমকে দেখতে মাঝে মাঝেই বাসায় আসে। বাসায় কোন ভালো রান্না হলে বাসায় এসে বলে বুড়ি (বাড়িওয়ালার বউ) নিঝুমের জন্য পাঠিয়েছে। এমন কি ঈদে জামা কিনেও দেয়। নিঝুম তাদেরকে দাদু বলে ডাকে। সে বাসায় মাঝে মাঝে বেশ সময় পার করে। এই পুরো বিষয়টা জাভেদ জানত না, কারণ তার সামনে এরুপ কখন ঘটেনি। এ কয়দিন বাসায় থাকায় সে জানতে পারলো। জাকের সাহেব তাঁর বুড়িসহ দুইটা কাজের মানুষ থাকেন৷ বাসা ভাড়াই তার মূল ইনকাম। তাঁর ছেলে মেয়ে দুজনেই দেশের বাইরে থাকে।

জাভেদ আজ নিয়ে সাত দিন হচ্ছে বাসা থেকে বের হয়নি। শুধু সিগারেট আনতে সাত দিনে দুই বার দোকানে গিয়েছে। সিগারেটের দাম বেড়ে গিয়েছে, তেরো টাকার সিগারেট পনেরো টাকা করে রাখছে। তাই জাভেদ সিগারেট অর্ধেক করে খাচ্ছে৷ কাঁচি দিয়ে সিগারেট অর্ধেক কেটে খায় আর পরে পুরান সিগারেটের মোতায় বাকি অর্ধেক ঢুকিয়ে খেতে হয়। খারাপ না সিগারেট খাওয়া টা অনেক কমে গিয়েছে একয়েক দিনেই।

আজ তার সিগারেট আনতে যেতে হবে, সিগারেট শেষ৷ তাছাড়া বাজারও করতে হবে এ কয়েক দিন খুব টানা টানি করে বিথি চালিয়েছে৷ আজ একটা ফর্দ ধরিয়ে দিয়েছে, বেশ লম্বা ফর্দ।

জাভেদ কাপড় পরে মুখে মাক্স লাগিয়ে বাজারের ব্যাগ নিয়ে বের হল। গত পাঁচ বছর ধরে থাকায় এখানে মুদি দোকান, ঔষধের দোকান, সিগারেটের দোকান সব তার পরিচিত। তাই ফর্দ দিলেই প্যাকেট করে বাজারের ব্যাগে সাজিয়ে দেয়। কোন টেনশন করতে হয় না।

জাভেদ বের হয়ে ব্যাগ হাতে হাঁটতে লাগলো আর চারপাশ দেখতে থাকলো৷ প্রচুর মানুষ রাস্তায়, মনে হচ্ছে না করোনার কোন প্রভাব আছে। জাভেদ একটা এটিএম বুথে ঢুকতেই তার আগে বুথের দারোওয়ান জাভেদের হাতে সাবান পানি স্প্রে মেরে দিল। জাভেদ পাঁচ হাজার টাকা তুলল। টাকা তুলে সে তার পরিচিত ঔষধের দোকানে গেলো হেক্সিজল কিনতে।

দোকানে গিয়ে বলল, করিম ভাই একটা ২৫০ মিলি হেক্সিজল দেন তো। দোকানের ছেলেটা কই আপনি একা যে? করিম ভাই হেক্সিজল দিতে দিতে বলল, ওকে বিদায় করে দিয়েছি, রাখতে পারছিলাম না।

‘কেন?’
‘ব্যাবসা নাইতো। দোকান ভাড়া দেয়াই মুশকিল।’

‘কি বলেন? ঔষধ কেনার তো হিড়িক পড়ে গেছে ভাই। হেক্সিজল, হ্যান্ড সেনিটাইজার এসব তো পাওয়া যাচ্ছিলো না। ঔষধ ব্যাবসায়ীরাই তো এখন ব্যবসা করছে।’

‘এসব বেচায় কি আর দোকান ভাড়া হয় ভাই। ডাক্তাররা তো ফোনে ফোনে প্রেসক্রাইব করে। রুগীরা সন্তুষ্ট হয়না। প্রেসক্রিপশন না আসলে ব্যবসা হয় না। করোনায় তো অনান্য রুগীরা ডাক্তার দেখাতে পারছে না। তাই জন্য ব্যবসা মন্দা যাচ্ছে। এসব খুচরা বিক্রি দিয়ে কয় টাকা আর হয় আর আমাদের মত ছোট দোকান সেটাও সমস্যা।’

‘কত ভাই?’
‘১৪০ টাকা রাখি আপনি ১৩০ দেন।’

জাভেদ মনে মনে বলল আপনি ১৪০ই রাখেন কিন্তু মুখে বলল না। ৫০০ টাকার একটা নোট বের করে দিল। টাকা খুচরা করে ফেরত দিল করিম। খুচরা টাকাটা পকেটে রেখে হাতে হেক্সিজল ঢেলে দু হাত ভাল মত ঘষলো জাভেদ। বোতলটা ব্যাগে রেখে বলল, ভাই যাই, ভলো থাকবেন বলে হাঁটা দিলো আর ভাবল যে এই কর্মচারীটার কি হবে। ঔষধের দোকানের কর্মচারীরও চাকরি চলে গেছে।

রাস্তায় দেখলে কিছু বুঝার উপায় নাই যে কোন সমস্যা চলছে দেশে। অথচ প্রতিদিন সাড়ে তিন চার হাজার মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে৷

মুদি দোকানে গিয়েও দেখে তিন জন কর্মচারীর মধ্যে দুই জন নেই। কিন্তু কোন কিছুই জিগ্যেস করলো না জাভেদ। লিস্টটা দিয়ে দোকানীকে বলল, ভাই এসব রেডি করে রাখেন আমি আসছি। জাভেদ মাছ-মাংস কিনতে চলে যায় আর কিছু কাঁচা বাজারও করতে হবে।

কাঁচা বাজারে গিয়ে ফর্দ দেখে দেখে আলু, পিয়াজ, মরিচ, শাক-সবজি কিনে পাচশ টাকার নোট দিলে দোকনী মাস্ক নামিয়ে জিভে হাত লাগিয়ে টাকা গুণে টাকা ফেরত দিল। জাভেদ দেখে বলল, তাহলে মাস্ক পরে থেকে কি লাভ। টাকা গুনলেন জিহবার থুথু হাতে লাগিয় নিয়ে। টাকায় সব চেয়ে বেশি করোনা ছড়ায়।

‘ভাইজান এত দিনের অভ্যাস কি এই কয়দিনে যায়। মাস্কতো পরতেছি পুলিশ-আর্মির ভয়ে। এটা পরে কি নিশ্বাস নেয়া যায় বলেন।’

কথা না বাড়িয়ে জাভেদ মাছের বাজারের দিকে গেল। বাজারে গায়ে গায়ে লাগা প্রায় মানুষ কারো কোন দূরত্বের বালাই নেই। কিছু মানুষ খুব বেশি সচেতন এই গরমেও পিপিই চোখ নাক মুখ ঢেকে বাজারে এসেছেন তাদের সংখ্যা হাতে গোনা যায়। আর কেউ এসেছেন মাস্ক আর গ্লভস পরে এদের সংখ্যা কিছুটা আছে। আর অধিকাংশ মানুষ মাস্কটা পরে কোন রকম এসেছে।

কিছু মানুষের তো মাস্ক পরা দেখে মনে হয় ওদের নাক মুখ থুতনির নিচে নাকি দাড়ি বেঁধে রেখেছে শিখদের মত। শিখ সম্প্রদায়রা দাড়ি না কাটায় এত বড় হয় যে তাড়া দাড়ি বেঁধে রাখে। ঠিক সেভাবে মাস্কটা পড়ে ব্যবসা করছে কেউ ঘুরে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ পুলিশ টহল দিতে আসে। আসার সাথে সাথে তাদের মত সচেতন মানুষ আর পাওয়া যায় না।

জাভেদ বেশ কয়েক ধরনের মাছ কিনলো মাছ বাজার ঘুরে সামনে বেশ কিছু দিন যেন বাজার আসতে না হয়। টেংরা মাছ, পাবদা মাছ, একটা আড়াই কেজি ওজনের রুই মাছ৷ ছোট ছোট চিংড়ি মাছ৷ কিনে সব কেটে পরিস্কার করে নিলো। মাছ বাজার থেকে মুরগীর বাজারের দিকে হাটা দিল৷ মুরগীর বাজারে একটা বিষয় খুব ভালো সবাই মাস্ক ঠিকমত পরে আছে। সম্ভবত মুরগির গন্ধের কারণে। জাভেদ চারটা মুরগী কিনে দ্রুত বের হল।

জাভেদ বাজারে ঘুরে ঘুরে তার মনে হয় বেকার এত কিছু করে সরকার কত মানুষের পেটে লাথি মেরেছে। সরকার ভলো করতে গিয়ে আরো খারাপ করে ফেলছে। সব কিছুই স্বাভাবিক করে দিলে পারে মানুষ জনের সচেতনতা দেখে মনে মনে ভাবে করোনাও হবে ফাঁকে জবটা হারাতে হলো।

বাজার শেষ করে জাভেদ বাসায় যাওয়ার জন্য একটা রিকশা ঠিক করে। রিকশায় করে বাজার নিয়ে ফিরছে। রিকশায় উঠে একটা সিগারেট খেতে মন চায়। কিন্তু সিগারেট কেনা হয়নি। জাভেদ রাস্তার পাশে বসা সিগারেট ওয়াল পাচ্ছে না। জাভেদের মনে হল রাস্তা ফেরী করে বেরানো মানুষ গুলোর কি যে অবস্থা। হয়তো তারা ঢাকা ছেড়ে চলে গেছে নিজ গ্রামে।

নিম্নবিত্তরা টিকে থাকার লড়াইয়ে খেলা খেলতে খেলতে জীবন পার করে। তাদের মধ্যবিত্তের মত স্টাটাস নিয়ে ভাবতে হয় না। জাভেদর এই জন্য নিম্নবর্গের মানুষদের পছন্দ, ওদের মিথ্যা নেই জীবনে৷ বাড়ায় চড়ায় গল্প হয়তো তারা বলে না। তাদের লোক দেখানো মিথ্যা হয়তো বলতে হয় না। মধ্যবিত্ত কথায় কথায় নিজেকে জাহির করার জন্য উঠে পরে লাগে। মিথ্যা তাদের জীবনে একটা অংশ। তাই তাদের জীবনে এত সংসয়। জাভেদ মনে মনে স্থির করে আর কোন লুকাচুপি না। আর কাউকে বানোয়াট স্ট্যাটাস দেখানো নয়!

রাস্তায় মুদি দোকানের মালামাল তুলে নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় হিসাব করে কত টাকা খরচ করলো। পাঁচ হাজার টাকার আর কত আছে পকেটে। রিক্সায় বসে পকেট থেকে টাকা বের করে দেখে পাঁচশো টাকার একটা নোট আর কিছু খুচরা টাকা আছে৷ তার মানে প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকার বাজার করতে হল।

রিক্সা ওয়ালা বলল, ভাইজান কোন দিকে যামু।  ডানে না বায়ে।
ডানে ডানে ডানে দুইটা বাড়ি পরেই, বলল জাভেদ।
জাভেদ রিক্সা ভাড়া দিতে গিয়ে বলল, কি অবস্থা তোমাদের খ্যাপ পাও তো।

‘পাই কিছু স্যার। তয় অবস্থা ভালা না। চলতে তো হইবো। তাই পেটের দায় বের হইতে হয়।’
একশত টাকার একটা নোট দিলে বিশ টাকা ফেরত দেয়। জাভেদ বলল, কত রাখলা।

‘স্যার আশি টাকা।’
‘কি বলো? এটা আশি টাকার পথ নাকি। চল্লিশ টাকার জায়গায় তুমি পঞ্চাশ রাখ ষাট টাকা রাখ। দাও আর বিশ টাকা দাও।’

‘স্যার আপনেরা যদি বাড়ায় না দেন তো আমরা গরীবরা বাঁচমু কেমনে।’ বলে আরও দশ টাকা ফেরত দিলো৷

‘শোন তুমি তো রিক্সা চালাতে পারছো, আমি তাও পারি না। আমার আজ সাত দিন হল কোন চাকরী নাই। আমি কাউকে তোমার মত করে বলতেও পারছিনা যে আপনেরা না দিলে আমরা বাঁচমু কেমনে। বুঝলা কিছু।’ টাকা দশটা নিয়ে ব্যাগ হাতে হাটা দিলো।

রিক্সাওয়ালা রিক্সা টান দিলো। কি যেন বির বির করে বলতে বলতে চলে গেল। মনে হয় রিক্সাওয়ালা বিশ্বাস করেনি কথাটা তাই হয়তো গালি টালি দিতে দিতে গেল।

জাভেদ গোসল করে ফ্রেস হয়ে এক কাপ চা চেয়ে বারান্দার চেয়ারে বসে মোবাইল ফোনে ফেসবুক দেখছে। একটা ভিডিও তার চোখে পরলো। বিবিসি বাংলার। ভিডিওতে দেখাচ্ছে এক লোক তার স্কুল বেচে দিবে। লোকটি বলছে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। কি করবো বাসা ভাড়া দিতে পারি না। তাছাড়া এই তিন চার মাসে ৫ লক্ষ টাকা ঋন হয়ে গেছে আর দুই তিন মাস এভাবে চললে ১০ লক্ষ টাকার ঋনে পরতে হবে তার আগে সম্মান নিয়ে ঋন পরিশোধ করে গ্রামে চলে যাই।

ভিডিওতে দেখাচ্ছে স্কুলের সামনে এক অধ্যক্ষ মহিলা আম বেঁচছে। মহিলা বাসা ভাড়া দিতে না পারায় এখন আমের ব্যাবসা করছে আর বাসা ছেড়ে দিয়ে স্কুলের দুটি ঘরে উঠেছে। স্কুলের বেঞ্চ গুলো সরিয়ে রেখে সেখানে তার স্বামী-সন্তান নিয়ে উঠেছে। এই ভিডিওটা দেখতে দেখতে চোখ ভিজে গেলো জাভেদের। কি অবস্থা এসব মানুষের। কোন যুদ্ধ নয় কোন সংঘাত নয়। শুধু কাজের অভাবে মানুষের আজ কি হাল।

জাভেদ চোখ মুছে নিলো। বিথি চা দিতে এসে দেখলো যে জাভেদ চোখ মুছছে কিছু বলল না বিথি। চা দিয়ে রান্না ঘরে চলে গেলো।

জাভেদ একটা চায়ে চুমুকে দিয়ে মোবাইলটা বন্ধ করে ঘর থেকে একটা কাটা অর্ধেক সিগারেট নিয়ে এসে জ্বালালো। চা খাচ্ছে আর সিগারেট টানছে। চোখে পানি অনবরত এসেই পরছে। জাভেদ এই শহরটা খুব অপচ্ছন্দ করতো এই শহরে কিচ্ছু নেই তার তারপরও একটু ভালো থাকার লোভে যে শহরটা ছাড়া হয়নি।

সিগারেটটা খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়। অর্ধেক সিগারেট টেনে আবার মোতাটা সংগ্রহ করে রাখে। সিগারেটের আগুন গোড়ায় পৌছালে সেটার আগুনটা ফেলে দিয়ে মোতা টুকু রেখে দেয় পরের অর্ধেক সিগারেটের জন্য।
আবার মোবাইল হাতে নেয় জাভেদ। ফেসবুক অন করতে চায় না কিন্তু তেমন কিছু করারও নাই তাই ফেসবুকে আবার যায়।

ফেসবুকে হঠাৎ এক ইরানী কবিকে নিয়ে একটা লেখা চোখে পরে। লেখাটিতে ক্লিক করতেই লেখাটি বের হয়। জাভেদ আগ্রহ নিয়ে পড়ে। লেখাটি নিম্নরপ…

সাবির হাকা

ইরাণের একজন নির্মাণ শ্রমিক ও কবি। জন্ম ১৯৮৬ সালে। ইরাণের পশ্চিম প্রান্তে কারমানশা প্রভিন্সে। এখন থাকেন ইরাণের তেহরানে। নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে সেখানে কর্মরত। সাবির একই সাথে নির্মাণ শ্রমিক ও কবি। সাবিরের কবিতা আমাদের বিবেকের দরজায় প্রবল ঝাঁকুনি দেয়। থর থর করে কাঁপিয়ে দেয়। সাবিরের কবিতায় অন্য এক ধূসর পৃথিবীর ছবি – সব দেশের শোষিত নিপীড়িত মজদুর জীবনের প্রায় অনুচ্চারিত কথন, অন্য মাত্রায়, অনন্য গভীরতায়।

সাবির বলেছেন, তেহরানে ঘুমোবার মত তাঁর কোন জায়গা নেই। কখনো সারা রাত হেঁটে হেঁটে ঘুরে বেড়ান। অনেকের মত তাঁরও কোন সামাজিক সুরক্ষা নেই। দারিদ্রকে আলাদা করে তাঁকে চিনতে হয় নি। জীবনের গোড়া থেকেই দারিদ্রের বিরুদ্ধে কঠোর সংগ্রাম ছিল, আজও তা অব্যাহত।

একটি সাক্ষাৎকার-এ সাবির বলেছিলেন,
“আমি ক্লান্ত। বড়ই ক্লান্ত। আমার এই ক্লান্তি  আমার  জন্মের আগে থেকেই ছিল। আমার মা আমাকে পেটে ধরার সময়ে লাগাতার মজদুরী করেছিলেন, সেই তখন থেকেই আমি মজদুর ব’নে গেছি। আমি আমার মায়ের ক্লান্তি অনুভব করি। মা’র ক্লান্তি যেন এখনো আমার শরীরে লেগে আছে।” 

সাবির হাকার একটা কবিতা ঘর নিয়ে:-

“ঘর”
তোমরা যদি বলো, সারা দুনিয়াকে আমি ওই নামে ডাকতে পারি!

দুনিয়ার সব দেশ, সব গ্রামকেও ডাকতে পারি ওই নামে।
আর আকাশ? হ্যাঁ তাকেও দিতে পারি ওই নাম!
সারা ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত কিছুকে ওই নাম ধরে ডাকতে,
এক মুহূর্তও দ্বিধা করবো না আমি!
কিন্তু দোহাই তোমাদের!

তেহরানের ভাড়া করা জানলাবিহীন এই কাল কুঠরীকে
তোমরা ওই নামে ডাকতে বোলো না!

আমি একে ঘর বলে কিছুতেই ডাকতে পারবো না।
জাভেদ সাবির হাকার আরো কয়েকটি কবিতা পড়লো তুঁতফল, ঈশ্বর, সরকার।

জাভেদের হাকাকে পছন্দ হলো। একজন দিনমজুর কবি। নিজেকেও সেই দিনমজুরের সাথে মিল পেল। জাভেদ নিজেও একরকম দিনমজুরই ছিলো। জাভেদের পুরনো দিনগুলো মনে পরে আজও।

জাভেদ ঢাকায় যখন প্রথম আসে তখন থাকার মত কোন পরিচিত জায়গা ছিলনা৷ একটা মেসে উঠেছিলো। কয়েক বছর হাড়ভঙ্গা খাটুনি করতে হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় দৌড়ে বেরিয়েছে একটা চাকুরির জন্য, কোন কাজের জন্য কিন্তু হচ্ছিলো না। তারপর একে একে বহু জব করতে হয়েছে।

এরপর বিয়ে করে বিথিকে, জাভেদ সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থা দেখে কেউ বিয়ে করতে রাজি হবার কথা না। বিথি এই অবস্থা জেনেও রাজি হলো। বিথি অবশ্য মামা মামীদের কাছে মানুষ। মামার সংসারে আর বোঝা হয়ে থাকতে চায়নি। বিথির অনেক উচু (বিত্তবান) ঘরের সম্বোধন এসেছিল কিন্তু সে রাজি হয়নি। বিথি আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে তার সমমানের কাউকেই সে বিয়ে করবে। জাভেদর গরীব হওয়ায় এই একটা লাভ হয়েছে বিথির মত এমন ভালো মেয়ে কপালে জুটে গেল। জাভেদ জীবনেও কল্পনা করতে পারনি এমন পরিশীলিত মেয়ে বিয়ে করতে রাজি হবে। বিয়ের পর বিথিকে নানা কষ্ট করতে হয়েছে।

এজন্য জাভেদ খুব কষ্ট পেত যে মেয়েটা বিয়ে করে একটু সুখের মুখ দেখবে তা না আরেক কষ্টের কারখানায় এসেছে। বিথি কখন এসব নিয়ে কিছু বলিনি। ঘর আলো করে একটা মেয়েও এলো একদিন। মেয়ে নিয়ে ঢাকায় এসে একটা রুম ভাড়া করে থাকতে হয়েছিলো দুই বছর। একরুমেই বউ বাচ্চাকে নিয়ে মেঝেতে বিছানা করে পার করতে হয়েছে কত কত রাত।

জাভেদের মা’র মুখ মনে পরেনা। জাভেদ ছোট থাকতেই তার মা মারা যায়। জাভেদের বাবা মার মৃত্যুর পর দ্বিতীয় বিয়ে করে। সেই মা যদিও জাভেদকে আদর করতো জাভেদও তাকে মা ডাকতো। কিন্তু নিজের মা না থাকার বিষয়টা সব সময় তাকে নাড়া দিত। জাভেদের বাবাও মারা যায় জাভেদ যখন কলেজে। জাভেদ তখন থেকে খুব এক অনুভব করে। জাভেদের নিজের দুই বড় বোন তাদেরও বিয়ে হয়ে যায় জাভেদের যখন বয়স ৮/৯। বোনরা বিয়ে করে নিজেদের সংসার নিয়ে মহা ব্যস্ত। দুই বোনের সংসার খুব টানাটানির সংসার।

জাভেদ চোখ বন্ধ করে মাথাটা পিছনের দালানে ঠেকা দিয়ে চুপ চাপ বসে রইলো। চারদিকের শব্দ কানে ভেশে আসছে। জাভেদে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পরলে আবার সেই স্বপ্নটা…

নগ্ন মেয়েটা কালো মেঘে কান্না করছে। জাভেদের হাত ধরে রয়েছে। সে কিছু বলছে না কিন্তু জাভেদর হাতটা ছাড়তে চাচ্ছেও না। সে জাভেদর সাথে থাকতে চায়। কালো মেঘে ক্রমশ তাকে নিচে দিকে টেনে নিচ্ছে। কিন্তু জাভেদকে কেন মেঘগুলো নিচে টানছে না। জাভেদ মেয়েটাকে দুই হাত দিয়ে ধরে উপরে তুলার চেষ্টা করছে কিন্তু মেয়েটা ধীরে ধীরে কোমর পর্যন্ত নেমে পরেছে। মেয়েটা শক্ত করে হাত ধরে রয়েছে, জাভেদও। মেয়েটা বুক পর্যন্ত ডুবে গেছে। মেয়েটার হাতটা আলগা হয়ে আসছে।

একটা কাক বারান্দার গ্রীলের কর্নারে এসে কা কা কা করে ডাকছে। জাভেদের দালানে মাথা হেলান দিয়া অবস্থাতেই চোখটা মেলল। কাকটা খুব তিব্র আওয়াজ করছে। কা কাঁ কা কাঁ কা। 

জাভেদ আবার চোখ বন্ধ করল। জাভেদ মেয়াটার চেহারা স্পষ্ট দেখতে পেল না। স্বপ্নে চেহারাটা দেখার কথা মনে থাকছে না কেন কে জানে৷ খুব মেয়াটাকে দেখতে মন চাচ্ছে। মেয়েটাকে বাঁচাতে মন চাচ্ছে কিন্তু কোন ভাবেই তার স্বপ্নে তার মাথা কাজ করাতে পরছে না।
বিথি এসে গায়ে হাত দিয়ে ডাকলো, এই ঘুমায় পড়লে নাকি। চলো খেতে চলো৷

চোখ দুটো খুলে বিথির চেহারাটা দেখে৷ চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ। বিথিকে গত এক বছরে কখনো সাজতে দেখেনি। বিথিকে সাজলে খুব সুন্দরী দেখায়। চোখে কাজল কপালে টিপ ঠোঁটে লাল রং কত দিন দেখিনা। কি অপরুপ চেহারাই না পেয়েছে। নিঝুম মেয়েটাও তার মায়ের মত হয়েছে।

জাভেদ বিথির বাহু দুটি ধরে বলল, আমরা ঢাকা ছেড়ে দেই। চলো গ্রামে চলে যাই।

বিথি জাভেদের হাত দুটোকে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে শক্ত করে ধরে বলল, ছেলেটাকে একা ফেলে যাই কি করে?

ছেলেটাকে বিথি এক মুহুর্তের জন্য ভুলতে পারে না। এই ছেলেটাকে মনে করে করেই শরীরটা এরকম ভেঙ্গে পরেছে।

বিথির বেশ কয়েক দিন হলো রাতে খুব জ্বর আসে। এই আসছে এই আবার চলে যাচ্ছে। করোনা কি না তা নিয়ে মহা টেনশনে পরেছে জাভেদ। জ্বর আসে ১০৩/১০৪ ডিগ্রি। গায়ে হাত দেয়া যায় না গা পুড়ে যায় মনে হয়। জাভেদ ভেজা গামছা দিয়ে মুখ, হাত পা মুছে দেয়। ঘাম ছেড়ে দিয়ে সকালের দিকে জ্বর নেমে আসে। বিথির দুই দিনেই শরীরটা একদম ভেঙে পরেছে। যদিও গত এক বছর ধরেই তার শরীরটা খারাপ থাকে।  ডাক্তার দেখিয়েছে বহুবার।

ডাক্তার বলেছিলেন, মানসিক ভাবে হাসি খুশি থাকার জন্য কিন্তু কি করা। একবার সিলেটে ঘুরতে গিয়েছিলো সেখানেও তার মন বসে না। পাঁচ দিনের ছুটি  তিন দিনেই ফিরতে হল বিথির ভালো লাগছিলো না বলে। বিথির নাকি বাসায় থাকতেই ভালো লাগে।

বিথির চোখ দুটো কেমন ভাবলেশহীন হয়ে উঠেছে,ছল ছল চোখে তাকিয়ে থাকে। চোয়ালটাও খানিকটা ভেঙ্গে পড়েছে। জ্বর সারাদিন থাকে না, রাতে করে আসে।
আজ বিকেল থেকেই জ্বর আর কমছে না। বিথি কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে পরেছে। কোন উপায় না পেয়ে ডাক্তার বন্ধুকে ফোন করলে বন্ধু  হসপিটালে ভর্তি করার পরামর্শ দিলো।

জাভেদ দেরি না করে একটা এম্বুলেন্স ডেকে তাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গেল। নিঝুমকে বাড়িওয়ালার বাসায় রেখে এসেছে। মেডিকেলে ডাক্তার পাওয়া যাচ্ছে না। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর একজন ডাক্তার দেখে বলল, রোগী দ্রুত আইসিইউতে ভর্তি করানো লাগবে। আমাদের এখানে আইসিইউ ফাঁকা নেই। আপনি অন্য কোথাও যোগাযোগ করুন।

জাভেদ কোন কিছু বুঝে উঠছে না। তাড়াহুড়ো করে এম্বুলেন্স নিয়ে প্রাইভেট হসপিটালে নিয়ে গেলো। এদিক সেদিক ফোন দিচ্ছে কোন উপায়ান্তর হচ্ছে না। কোন আইসিইউ পাওয়া যাচ্ছে না।

এম্বুলেন্সে বিথি জাভেদের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। এম্বুলেন্স হুইসেল দিচ্ছে আর রাস্তায় চলছে। বিথি জাভেদকে কিছু বলার জন্য ইশারা করলো। বিথি কি বলছে বুঝা যাচ্ছে না। জাভেদ বলল কি বলছো। জাভেদ কানটা বিথির মুখের কাছে নিল।

বিথি বলল, ‘তুমি মেয়েটার খেয়াল রাখবে আমি ছেলেটার খেয়াল রাখবো।’

বিথি জাভেদ হাত আরও শক্ত করে ধরে রাখার চেষ্টা করছে। জাভেদও তাকে খুব করে ধরে রাখছে। এম্বুলেন্স এক হসপিটালের সামনে এসে দাঁড়াল সেখানেও আইসিইউ ফাঁকা নেই। তাছাড়া করোনা টেস্ট করানো আছে কিনা তাও জানতে চাইলো।

এম্বুলেন্স গ্রীন রোড থেকে ঘুরে মোহাম্মদপুরের দিকে রওনা হল। শব্দ তুলে এম্বুলেন্স ছুটছে। জাভেদ শক্ত করে হাত ধরে আছে বিথির। বিথি কেন যেন হাতটা ছেরে দিয়ে আছে। মোহাম্মদপুরে হাসপাতালের সামনে এম্বুলেন্সটার শব্দ এসে থামলো!

লেখকঃ
সৈয়দ মুহাম্মদ জুবায়ের।
প্রভাষক, থিয়েটার এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ,তেজগাঁও কলেজ, ঢাকা।

প্রচ্ছদঃ দেব।